বৃহস্পতিবার , ৪ নভেম্বর ২০২১ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
  1. অর্থনীতি
  2. আইন ও আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ঈশ্বরদী
  5. করোনাভাইরাস
  6. কৃষি
  7. ক্যাম্পাস
  8. খেলাধুলা
  9. গল্প ও কবিতা
  10. চাকরির খবর
  11. জাতীয়
  12. তথ্যপ্রযুক্তি
  13. তারুণ্য
  14. ধর্ম
  15. নির্বাচন

ঈশ্বরদীর বন-জঙ্গলে ভরা গ্রামটি এখন যেন এক টুকরো রাশিয়া

প্রতিবেদক
বার্তা কক্ষ
নভেম্বর ৪, ২০২১ ৬:৫২ অপরাহ্ণ

ভুতুড়ে গ্রাম মনে হতো। সড়কের এপার দিয়াড়সাহাপুর আর ওপাড়ে চরসাহাপুর। দিনের আলোতে নাকি মানুষজন চলাচল করতেও ভয় পেতো। গুটিকয়েক এলাকার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মিলে উদ্যোগ নেন, সপ্তাহে দুইদিন হাট বসবে। হাটের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘নতুনহাট’।
ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের দুই-তিন গ্রামের মানুষ নতুনহাটে ছাগল বিক্রি শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে চৈতালি ফসল হাটের বাজারে বিক্রি শুরু হয়। ছন-বাঁশের কয়েকটি ছাউনি দোকান ছাড়া কিছু ছিল না। গাউনের প্যান্ট বিক্রি হতো।

সড়কটি ঈশ্বরদী মোটরস্ট্যান্ডের সঙ্গে সংযোগ সড়ক হওয়ার কারণে দক্ষিণাঞ্চল-উত্তরাঞ্চলে আসা যাওয়ার করার একমাত্র সড়ক ছিল বলে রোডের আম আই-কে রোড (ঈশ্বরদী-কু্ষ্টিয়া) সড়ক হিসেবে পরিচিত ছিল।সন্ধ্যা হলে ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঝিঁ ঝিঁ পোকা আর শিয়ালের ডাকে ভুতুড়ে অবস্থা সৃষ্টি হতো যে গ্রাম। সে গ্রামে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দেশি-বিদেশি রাশিয়ান নাগরিকদের বসবাসের জন্য ‘গ্রিন সিটি’ নির্মাণ করা হয়। ফলে তিন বছরের ব্যবধানে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি মানুষদের চলাফেরায় সরগরম থাকে রূপপুর। নতুনহাটের দৃশ্যপট বদলে গেছে।



ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র যেমন বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছে, তেমনি কয়েকহাজার বিদেশিদের পদচারণাতে রাশিয়ান বাঙালির সঙ্গে মিলে-মিশে থাকা যেন সংস্কৃতি পাল্টিয়ে ইউনিয়নের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হয়েছে দেশের বড় মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের রাশিয়ান নাগরিকদের বসবাসের জায়গা গ্রিন সিটির কারণেই। অজপাড়াগাঁ দিয়াড়সাহাপুর নিভৃত পল্লীটি এখন ঝলমলে শহর। পাল্টে গেছে গোটা এলাকার চেহারা।



প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬১ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৬২ সালে ঈশ্বরদীর পাকশী ইউনিয়নের ‘রূপপুর’ দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। সমীক্ষা দল কাজ শুরু করে দিয়াড়সাহাপুরে ১৯৬৮ সালে অফিস, রেস্ট হাউজ, বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন, আবাসিক ইউনিট নির্মাণ কাজ আংশিক সম্পন্ন করেছিল। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৯ সালে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। ৪৬টি বছর ৩২ একর জমিতে জরাজীর্ণ ভবনগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। জঙ্গলে ভরা শিয়াল, বেজি, বিষধর সাপ আর পোকা-মাকড়ের ঘরবসতি ছিল। এলাকার মানুষ দিনের আলোতেও যেতে ভয় করতো। পুরোনা জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে মাস্টারপ্লান অনুযায়ী বহুতল ভবন ‘গ্রিন সিটি’ নির্মাণ শুরু হওয়ার পর তিন বছরের ব্যবধানে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। এখন বর্তমানে রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণেই আলোয় আলোকিত হয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ের একটি গ্রাম দিয়াড়সাহাপুর নতুনহাট।সরেজমিন দিয়াড়সাহাপুরে দেখা যায়, বিদেশি নাগরিকদের বসবাস করার জন্যই গড়ে তোলা বহুতলভবণ ‘গ্রিন সিটি’ নির্মিত হওয়ার কারণে বেসরকারি ব্যাংকের শাখা, বিদেশিদের বিনোদনের জন্য আধুনিক দৃষ্টিনন্দন পার্ক গড়ে উঠেছে। এছাড়া গড়ে উঠেছে সেলুন থেকে শুরু করে সবজি বাজার, মাছ-মাংসসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সব দোকান।

ঈশ্বরদী সাহাপুর ইউনিয়নে ছোট গ্রামের ভেতরে গ্রিন সিটির মূলফটকজুড়ে আধুনিকতার ছোঁয়া। দৃষ্টিনন্দন দোকান-পাটের সমারোহ। সুপারশপ থেকে শুরু করে চাইনিজ রেস্তোরাঁ, শপিংমল, ক্যাফে। বেশিরভাগ দোকানের সাইনবোর্ডগুলো রাশিয়ান ভাষার। বিদেশি নাগরিকরা ইচ্ছে মতো বেশ আন্তরিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে দেখা মেলে। তাদের চলাফেরার কারণে গ্রাম হয়েছে আধুনিক শহর। বদলেছে দৃশ্যপটসহ এলাকার আর্থ-সামাজিক চিত্র।

এদিকে, আংশিক বাংলাভাষা আয়ত্ত করে নিয়েছেন কিছু বিদেশি। আবার দোকানিরাও তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাশিয়ার ভাষা আয়ত্ত করে নিয়েছেন। দিয়াড়সাহাপুরের নতুনহাট এলাকা শুধু নয়, তাদের চলাফেরার জন্য উপজেলার সলিমপুর, পাকশী ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামে লেগেছে পরিবর্তনের আধুনিক ছোঁয়া। দেশের একটি ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রামে যেন বিদেশি সংস্কৃতির ছোঁয়া।


অজপাড়াগাঁয়ের ছোট ভুতুড়ে গ্রাম, এখন ঝলমলে শহর। আর দিয়াড়সাহাপুর গ্রামটি এখন ইউরোপের ছোট শহর মনে হয়।


দিয়াড়সাহাপুর গ্রামের রেজাউল বিশ্বাস (৬০) বলেন, কয়েকজন গণ্যমান্য মুরব্বি মিলে সপ্তাহের দু’দিন হাট বসানোর উদ্দোগ নেওয়া হয়। নাম দেওয়া হয় নতুনহাট। বৃটিশ আমলের থেকে শুধু ছাগলের হাট বসতো সপ্তাহে দু’দিন। পরে চৈতালি ফসল বিক্রি হতো। বন আর জঙ্গলে ভরা ছিল এলাকা। দিনের বেলায় মানুষ হাঁটতে ভয় পেতো। আমি দীর্ঘদিন নতুনহাট মোড়ে খাবার হোটেলের ব্যবসা করেছি। দু’বছর আগে লোকজন তেমন দেখাই মিলতো না। বছর দুয়েক আগে সপ্তাহে রোব-বুধবার ছাগলের হাট ছাড়া লোকজনের দেখা মিলতো না। গ্রিন সিটির কারণে বিশাল বাজার বসছে প্রতিদিনই। অজপাড়াগাঁ বদলে গ্রাম এখন শহর। দিয়াড়সাহাপুর অনেক দেশ-বিদেশিদের ছোট শহর। তাই দিনে এক বেলা শুধুই ‘চা’ বিক্রি করি।

একই গ্রামের আবির স্টোরের সজিব হোসেন বলেন, সৌদি প্রবাসী ছিলাম। বছর দুই পর বাড়িতে এসে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমার নিজের গ্রাম আমিই চিনতে পারিনি। পরে আর ফিরে যাওয়া হয়নি প্রবাসে। ধানের মিল চাতালের কারণেই বিখ্যাত ছিল দিয়াড়সাহাপুর। আই কে রোডজুড়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক ট্রাক আসতো। সেই রোডে গ্রিন সিটির কারণে বদলে গেছে গ্রামের সেই দৃশ্যপট।

ব্যবসায়ী নাহিদূল ইসলাম নোবেল (৫০) বলেন, হঠাৎ যদি কেউ দিয়াড়সাহাপুর আসেন, নিশ্চিত বলতেই হবে তিনি ইউরোপের কোনো ছোট শহরে এসেছেন। বেলারুশ, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, ভারত, জর্জিয়াসহ কয়েকটি দেশের মানুষদের চলাফেরা বাড়ির সামনে বসে দেখা যায়।

দিয়াড়সাহাপুর গ্রামের আল-আমিন (৪০) বলেন, আমি সপ্তাহে দু’দিন নতুনহাট মোড়ে চুল কাটার কাজ করতাম। ১০০-২০০ টাকা আয় হতো। সংসারে বেশ অভাব ছিল। দিয়াড়সাহাপুর গ্রামে গ্রিন সিটি হওয়ার পর আমি দুই বছরের মধ্যে নিজে একটি এসি সংযুক্ত করে আধুনিক সেলুন দিয়েছি। রাশিয়ান নাগরিকদের চুল-সেভ কাটলে ৫০০ টাকা, আর শুধুমাত্র চুল কাটলে ২০০ টাকা দেন। এতে সারাদিন আমার আয় প্রায় ৩-৪ হাজার টাকা। আমি কর্মচারি রেখেছি। তিনি আয় করেন প্রায় হাজার টাকা। গ্রিন সিটি নিজের এলাকায় হওয়ার কারণে এলাকার উন্নয়নের সঙ্গে আমরাও স্বাবলম্বী হয়েছি।

এদিকে, জমিন উদ্দিন (৭০) নামে রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মচারী আক্ষেপ করে বলেন, এক টুকরো রাশিয়া কিংবা রুশনগরী কীভাবে রূপপুর হয়! এটা যদি হয়, তাহলে হবে সাহাপুর ইউনিয়নের দিয়াড়সাহাপুর, চর সাহাপুর। কারণ, আবাসিক গ্রিন সিটিটি দিয়াড়সাহাপুরে। আর দোকানপাটগুলো গ্রিন সিটির চর সাহাপুর।

তিনি বলেন, গ্রিন সিটিকে কেন্দ্র করে যেসব আধুনিক শপিংমল, দোকান-পাট গড়ে উঠেছে তা দিয়াড়সাহাপুরে। কিন্তু, বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে দেখলাম, রূপপুরকে রুশনগরী বলা হয়েছে। আমরা সত্যিই মর্মাহত। এ ধরনের ভুল সংবাদ পরিবেশনের কারণে। কেননা, আমাদের গ্রাম থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে রূপপুর। আমরা আমাদের গ্রামকে চর সাহাপুরের নতুনহাটের দিয়াড়সাহাপুর হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। যদিও বিভিন্ন বিদেশি নাগরিকদের চলাফেরার কারণে আধুনিক হয়েছে। আসলে তাদের প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার দরকার ছিল।শর্মা জিয়েস্টের মালিক শাকিল হোসেন বলেন, রাশিয়ানদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আয়ত্ত করেছি তাদের ভাষা। রাশিয়ানদের একটি প্রিয় খাবার শর্মা। শশা, টমেটো, পেঁয়াজ, পাতাকপি, গাঁজর, সস, চিজের সঙ্গে রুটি দিয়ে শর্মা তৈরি করতে হয়। শর্মা সাত রকমের বিভিন্ন দামে বিক্রি হয়। সপ্তাহের দু’দিন বিশ্বাস মার্কেটে বিদেশি নাগরিকদের মিলনমেলা ঘটে।

স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শারমিন জাহান বলেন, কয়েক বছর আগেও দিয়াড়সাহাপুর গ্রামের শিশু-কিশোররা স্কুলে অনেক কম যেতো। কম পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া করেছে। অনেকেই প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরুলে, তাদের ধানের মিলে কাজে দিয়ে দিতো। অস্বচ্ছল ছিল অনেক পরিবার। সেই দিন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গ্রিন সিটির কারণে আধুনিক হতে শিখেছে এখানকার জনগণ। এখন দিনমজুর শ্রমিকরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠান।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস অনুভূতি জানিয়ে বলেন, পাঁচ বছর আগেও নতুনহাট দিয়াড়সাহাপুরে অবকাঠামোর কোনো উন্নয়নই কিন্তু ছিল না। দেশের বৃহৎ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত বিদেশিদের বসবাসের জায়গা গ্রিন সিটির কারণেই পাল্টে গেছে গোটা এলাকার চেহারা।

গ্রিন সিটিতে ২১টি সুদৃশ্য ভবন নির্মিত হবে। বর্তমানে ১৬টি ভবনের বসবাস করছেন ইউরোপের ৩ হাজার ৮০০ নাগরিক। অন্য ভবনগুলোর কাজ চলছে। একত্রে এত বিদেশি একসঙ্গে চলাচলে কারণে যে গ্রামটি কয়েক বছর আগে অন্ধকারে ছিল, গ্রিন সিটির সঙ্গে সঙ্গে সেই এলাকাজুড়ে এখন অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটে দৃশ্যমান উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। ভুতুড়ে গ্রাম বিদেশিদের শহরে রূপ নিয়ে গোটা সাহাপুর ইউনিয়নের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়েছে।

সর্বশেষ - ঈশ্বরদী

আপনার জন্য নির্বাচিত
error: Content is protected !!