আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেড (এসিসিএফ ব্যাংক লিঃ) অবৈধ। পরিকল্পিতভাবে দেশের সাধারণ মানুষকে অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে তাদের ব্যাংক শাখায় অর্থ জমা (ডিপোজিট) করাচ্ছেন। আর আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ হলেই ব্যাংকে তালা ঝুলিয়ে উধাও হওয়া শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই গ্রাহকের প্রায় ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে পাবনার চাটমোহর পৌরসভার নতুন বাজার খেয়াঘাটস্থ শাখাটি উধাও হওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। আর টাকা ফেরত না পেয়ে গ্রাহকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কো-অপারেটিভ সোসাইটি আইনে সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়ে অবৈধভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল এ প্রতিষ্ঠানটি। এই কারণে পাবনার ঈশ্বরদী শহরের বাজার রোডের কদমতলাস্থ আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেড শাখাসহ পাবনা জেলাসহ দেশের সকল স্থানের শাখা থেকে গ্রাহকদের কষ্টের টাকা তুলে নেওয়ার জন্য সমবায় অধিদপ্তরের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সমবায় অফিস থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেড অবৈধ
ইতোমধ্যেই অবৈধ ও ভূয়া আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোঃ তাজুল ইসলাম গ্রাহকের জমাকৃত আমানতের ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমান পাওয়া জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রতিষ্ঠানের মহা ব্যবস্থাপক (জিএম) রাফিউল কাদের’এর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হয়। তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানার পর মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন করে সুইচ অফ করে রাখেন। প্রতিষ্ঠানটির রাজশাহী রিজেনাল কর্মকর্তা ড.মাহবুবুর রহমানকে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে রং নম্বর বলে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। এভাবে প্রত্যেকে পরস্পরের সহযোগিতায় অভিনব উপায়ে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাবনার চাটমোহর পৌরসভার নতুন বাজার খেয়াঘাট এলাকায় মাসিক ছয় হাজার টাকা ভাড়ায় অফিস নিয়ে জাঁকজমক ভাবে কার্যক্রম শুরু করেছিল আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চাটমোহর শাখার ব্যবস্থাপক, পাবনা সদর উপজেলার দ্বীপচর গ্রামের মিজানুর রহমান ও অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারী অল্প বিনিয়োগে অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে শত শত গ্রাহকের নিকট থেকে প্রায় ৮০ লাখ টাকা স্থায়ী আমানত সংগ্রহ করেন।
এই ব্যাংকে চাটমোহর শাখার গ্রাহক খেয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা মজিদা বেগমের নিকট থেকে ২০২০ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা মাসিক মুনাফা ডিপোজিটে জমা রেখেছেন। মধ্য শালিখা গ্রামের আতাউর রহমানের ৮ লাখ টাকা, বালুচর মহল্লার দুলাল সরকার ৪ লাখ, নতুন বাজার এলাকার মাজেদা খাতুন ৫ লাখ, মধ্য শালিখা মহল্লার রোকেয়া খাতুন ৫ লাখ, শাহী মসজিদ এলাকার ইসরাইল হোসেন এক লাখ , জগন্নাথপুর গ্রামের সুমাইলের ৫ লাখ, বগুড়ার নজিবুর রহমানের দুই লাখ টাকাসহ কয়েকশ গ্রাহকের নিকট থেকে প্রায় ৮০ লাখ টাকা আমানত সংগ্রহ করেন। এরপর বিগত প্রায় ৬/৭ মাস যাবত ব্যাংকটিতে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে ম্যানেজার মিজানুর রহমানসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উধাও হয়েছেন। গ্রাহকরা খোঁজ করে ব্যাংকের কাউকেই আর পাচ্ছেন না। টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমানের পাবনার বাড়িতে গিয়ে ধর্ণা দিয়েও কোন সুফল পাচ্ছেন না। ফলে ব্যাংকে সঞ্চিত টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শংকায় কাটতে তাদের প্রত্যেকের দিন।
বিভিন্ন সুত্রে ও সমবায় অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, ঢাকার শাহবাগস্থ আজিজ সুপার মার্কেটে অফিস নিয়ে ১৯৮৪ সালে আজিজ কো-অপারেটিভ সোসাইটি কাজ শুরু করে। এরপর বিভিন্ন সময় নাম পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানটি আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেড নামে দেশ ব্যাপী কাজ করছে। সুত্রমতে, দেশব্যাপী প্রতিষ্টানটিকে মাত্র ২৬ টি শাখার করার অনুমোতি দেওয়া হয়। কিন্তু সমবায় অধিদপ্তরের বিধিনিষেধ অপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠানটি দেশব্যাপী ব্যাঙের ছাতার মতো ১৬০ টি শাখা চালু করে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। সম্প্রতি কয়েক বছর আগে সরকারীভাবে সমবাং নিবন্ধন অধিদফতর এই প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকিং কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে রিট করে অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষকে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ব্যাংকে অর্থ ডিপোজিট করাচ্ছে।
এদিকে ঈশ্বরদী, পাবনার সুজানগরের বনগ্রাম, চিনাখড়া, সাথিয়া, চাটমোহরে আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের শাখায় কয়েক হাজার গ্রাহকের প্রায় অন্তত ১৫/২০ কোটি টাকা ডিপোজিট করা রয়েছে। ডিপোজিটের বিপরতি ঘোষণা অনুসারে ঋণও প্রদান করা হয়নি। ব্যাংকটি প্রতিদিন, সাপ্তাহিক ও মাসিক হিসেবে গ্রাহকের নিকট থেকে ঋণ প্রদানের নামে সঞ্চয় ও আমানত আদায় করছে। এর মধ্যে ব্যাংকটির ঈশ্বরদী শাখায় সাধারণ গ্রাহকদের প্রায় দেড় কোটি টাকা সঞ্চয় ও আমানত ডিপোজিট করা রয়েছে।
এ ব্যাপারে পাবনার চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈকত ইসলাম জানান, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। ভূক্তভোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটি বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাটমোহর সমবায় কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মোঃ রফিকুল ইসলাম ও ঈশ্বরদী সমবায় কর্মকর্তা মোঃ আমজাদ হোসেন সমবায় অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে জানান, আজিজ কো-অপারেটিভ কমার্স অ্যান্ড ফাইন্যান্স ব্যাংক লিমিটেডের কোন কার্যক্রম স্থানীয় সমবায় অফিস থেকে পর্যবেক্ষক করা ও বা অডিট করা হয় না। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। প্রতিষ্টানটির ব্যাংকিং কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহককে তাদের আমানত (জমাকৃত) টাকা দ্রুত উত্তোলন করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
তাঁরা আরো জানান, ইতোমধ্যেই প্রতিষ্টানটি পরিচালক মোঃ তাজুল ইসলাম গ্রাহকদের ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে কারাগারে বন্ধি হয়েছেন।